সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি ধারণা সংসারের সব কাজই নাকি নারীর দায়িত্ব। রান্না-বান্না, কাপড় ধোয়া, সন্তানের যত্ন থেকে শুরু করে বয়স্ক অভিভাবকের দেখভাল সবকিছুই যেন স্বাভাবিকভাবেই নারীর ওপর বর্তায়। অথচ একই পরিবারের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক ভারও নারীরা সমানভাবে বহন করে থাকেন।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে পরিবার ও সমাজ এখনো ‘গৃহকর্ম’কে কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। ফলে নারীর পরিশ্রম অদৃশ্য থেকে যায়, মূল্যায়নও হয় না।
অথচ গবেষণা বলছে গৃহস্থালি শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য যোগ করলে একটি দেশের জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ গড়ে উঠতে পারে।
একইসঙ্গে পরিবর্তিত সময় ও জীবনধারা নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে। আজ নারী-পুরুষ উভয়েই কর্মজীবী পরিবারের আয়ে অবদান রাখে। তারপরও গৃহকর্মের বড় অংশ নারীই সামলায়। এই বৈষম্য শুধু নারীর শারীরিক ও মানসিক চাপে যোগ করে না, সম্পর্কের ভারসাম্যকেও নষ্ট করে দেয়।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, ‘সংসার’ একটি যৌথ দায়িত্ব। পরিবার তখনই উন্নত ও সুস্থ থাকে, যখন সেখানে কাজ বণ্টন হয় সমতা ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে। সন্তানের সামনে একটি ন্যায্য পরিবারিক মডেল তৈরি হয়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অসাম্য নয়, বরং সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের শিক্ষা দেয়।
গাজীপুরের শারমিন আক্তার তিন সন্তানের মা। সকাল ৫টায় ঘুম থেকে উঠে তিনি একাই পরিবারের নাশতা, বাচ্চাদের টিফিন, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার থেকে শুরু করে বৃদ্ধ শাশুড়ির দেখভাল সব কিছুই সামলান। দুপুরে স্বামীর জন্য খাবার ঠিকমতো গরম না থাকলে তাকে শুনতে হয় কথার খোঁচা,
“সারাদিন তো বাসায়ই থাকো, এত কাজ সামলাতে কষ্ট কী?”
বাসায় তুমুল কাজের পরও শারমিনের নিজের জন্য পাঁচ মিনিটও সময় থাকে না। অথচ তার স্বামী দিনশেষে বাড়ি ফিরে মোবাইলে সময় কাটান, এক কাপ চা তুলে দেওয়ার আগ পর্যন্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেন, ঘরের কোনো কাজে হাত লাগান না।
শারমিন বলেন, “আমি যদি একদিন কাজ না করি, পুরো সংসার থেমে যায়। কিন্তু আমার পরিশ্রম কেউ দেখে না। শুধু ভুল খুঁজে।”
শারীরিক ক্লান্তি, মানসিক চাপ সবকিছু জমতে জমতে কয়েক মাস আগে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডাক্তার বলেছেন, অতিরিক্ত পরিশ্রম আর বিশ্রামের অভাবেই তার এই অবস্থা।
সংসার কোনোভাবেই শুধু নারীর কাজ নয়। এটি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন। জীবনযাত্রার মান, সম্পর্কের গুণগত মান এবং একটি পরিবারের শান্তি সবকিছুই নির্ভর করে দায়িত্বের ন্যায্য ভাগাভাগির ওপর। সময় এসেছে পরিবারকে নারীর নয়, দুই জনের যৌথ যাত্রা হিসেবে দেখার।
এইচ.আর.শাওন

