হবিগঞ্জের বাহুবলে বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) পরিচালনার আড়ালে কথিত এক মানবাধিকার নেতার ভয়াবহ ধর্ষণকাণ্ড ও পর্নোগ্রাফি চক্র পরিচালনার তথ্য সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই চক্র পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে নুরুল ইসলাম ওরফে নুরুল হক নামের ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ধর্ষণের পর নারীদের চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে বন্ধু ও প্রবাসীদের হাতেও তুলে দিতেন তিনি। অবশেষে রোববার সন্ধ্যায় র্যাব-৯-এর শায়েস্তাগঞ্জ ক্যাম্পের একটি আভিযানিক দল চুনারুঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করেছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও গ্রেপ্তার
জানা গেছে, অসহায় নারীদের ধর্ষণ, ব্ল্যাকমেইল এবং পর্নোগ্রাফি চক্রের মূল হোতা নুরুল ইসলাম ওরফে নুরুল হকের বিরুদ্ধে এক ভুক্তভোগী মামলা দায়ের করেন। সেই মামলার প্রেক্ষিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। নুরুল হক বাহুবল উপজেলার মিরপুর ইউনিয়নের লাকুড়ীপাড়া গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে।
সম্প্রতি অভিযুক্ত নুরুল হকসহ তার সহযোগী ওসমানীনগরের আবুল বশর (মামুন বখত) এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনকে আসামি করে বাহুবল থানায় মামলা করেন এক তরুণী। ২০১২ সালের পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলাটি রুজু করা হয়।
জিম্মি করে দফায় দফায় ধর্ষণ
মামলা ও স্থানীয় সূত্র জানায়, চুনারুঘাট উপজেলার এক তরুণী বছরখানেক আগে নুরুল হকের সংস্থায় অফিস সহকারী হিসেবে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকেই নুরুল হক তাকে বিভিন্নভাবে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কার্যালয়ের ভেতরেই তাকে প্রথমবার ধর্ষণ করা হয়। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ধর্ষণের সময় নুরুল হক কৌশলে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে রাখেন। পরবর্তীতে সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টানা পাঁচ মাস তাকে জিম্মি রেখে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়।
বন্ধু ও প্রবাসীদের হাতে তুলে দেওয়া
অভিযোগে ওই তরুণী জানান, তাকে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে নুরুল হকের বন্ধু ও প্রবাসীদের হাতেও তুলে দেওয়া হতো। সম্প্রতি তিনি চাকরি ছেড়ে দিলে সেই আপত্তিকর ভিডিওগুলো বিদেশে থাকা বন্ধুদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার প্রতিকার চেয়ে তিনি বাহুবল থানায় মামলা দায়ের করেন।
আরও একাধিক ভুক্তভোগী
পুলিশ জানায়, শুধু ওই তরুণী নন, ওই প্রতিষ্ঠানের আরও একাধিক নারী কর্মী একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। চুনারুঘাট ও বাহুবলের আরও দুই তরুণী একইভাবে ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাশিদা নামে এক শিক্ষার্থী হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য
র্যাব-৯, সিপিসি-৩, শায়েস্তাগঞ্জ ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট সাজ্জাদ হোসেন জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে পর্নোগ্রাফি মামলার প্রধান অভিযুক্ত নুরুল হককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, সে ‘দরিদ্র কল্যাণ সংস্থা’ নামক এনজিওর আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে অসহায় নারীদের জিম্মি করে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ব্ল্যাকমেইল করে আসছিল।
বাহুবল মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, মামলার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। পলাতক থাকা অবস্থায় র্যাবের সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতে সোপর্দ করা হবে।

