নতুন ‘এমপিও নীতিমালা-২০২৫’ জারি করার পর বিপাকে পড়েছেন শিক্ষকতায় যুক্ত থাকা সাড়ে তিন হাজার মফস্বল সাংবাদিক। তারা বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করতে উচ্চ আদালতে রিট করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নবগঠিত এমপিওভুক্ত শিক্ষক সাংবাদিক গ্রুপ সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
গত ৭ ডিসেম্বর এমপিওভুক্তির নতুন জনবল কাঠামো ও নীতিমালা-২০২৫ জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নতুন নীতিমালায় এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক-কর্মচারী একই সঙ্গে একাধিক চাকরি বা লাভজনক পদে থাকতে পারবেন না। এর মধ্যে সাংবাদিকতা বা আইন পেশাও আছে। এটি করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও বাতিল করা যাবে। এই বিধান সন্নিবেশিত করায় বিপাকে পড়েছেন বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক।
এ বিধান এরই মধ্যে দেশজুড়ে শিক্ষকসমাজে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করেন, এমন কয়েক হাজার শিক্ষক-সাংবাদিকের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
অনেক জেলা ও উপজেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। অনেকে উপজেলা/জেলা পর্যায়ে স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকা, অনলাইন বা টিভি চ্যানেলের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে থাকেন। তাদের মতে, বিদ্যালয়ের দায়িত্ব শেষ করে সমাজসেবামূলক বা সম্মানীর বিনিময়ে কোনো কাজে যুক্ত থাকা অন্যায় নয়।
ঠিক কতজন শিক্ষক সাংবাদিকতায় যুক্ত, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নতুন নীতিমালা জারির পর এ নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষক-সাংবাদিক গ্রুপ’ খোলা হয়েছে। এই গ্রুপে গত দুই দিনে প্রায় ৩০০ জন যোগ দিয়েছেন। তারা ‘বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক-সাংবাদিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম’ তৈরি করতে যাচ্ছেন।
এই গ্রুপের আহ্বায়ক মাসুদ হাসান বাদল। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনের জেলা প্রতিনিধি ও শেরপুর মডেল গার্লস কলেজের সহকারী অধ্যাপক। তিনি সমকালকে বলেন, প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক সাংবাদিকতায় যুক্ত। এটাকে আমরা দ্বৈত পেশা মনে করি না। সবাই নামমাত্র সম্মানী পান, কেউ বেতনভুক্ত নন। সম্মানী নেওয়া বৈধ। এটা সরকারি কর্মকর্তারাও নেন।
তাঁর মতে, শিক্ষকরা জনপ্রতিনিধি হতে পারলে, কাজি হতে পারলে সাংবাদিকতা করতে পারবেন না কেন? প্রশাসনের একটি অংশ শিক্ষক-সাংবাদিকদের প্রতি রাগান্বিত হয়ে এ ধরনের নীতিমালা করেছেন।
শিক্ষক ও বাংলা ট্রিবিউনের মাদারীপুর প্রতিনিধি মো. রফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সরকারি চিকিৎসকরা হাসপাতালে দায়িত্ব শেষে চেম্বারে রোগী দেখেন; এমপিওভুক্ত অনেক শিক্ষক দোকান, কৃষিকাজ বা টিউশনি করে আয় করেন। এগুলো দোষের না হলে সাংবাদিকতা কেন দোষের হবে? তিনি আরও বলেন, নীতিমালাটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
হয়রানির ভয়ে অনেকে পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। শিক্ষক-সাংবাদিক বাদল আহমেদ বলেন, মফস্বলে সাংবাদিকতার মান নিচে নেমে গেছে। শিক্ষক সমাজের যোগ্য, লেখালেখিতে দক্ষ একটি অংশ সততার সঙ্গে যুগের পর যুগ ধরে কাজ করছেন। এখন তাদের সৃজনশীলতার পথ বন্ধ করা হচ্ছে।
হুসাইন আলীর মন্তব্য, অতীতে এমপিওভুক্ত অনেক শিক্ষক জনপ্রতিনিধি হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সংসদ সদস্য পর্যন্ত নির্বাচিত হয়েছেন। তারা মাসের পর মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থেকে বেতন তুলেছেন। সেটা দোষের না হলে সাংবাদিকতা কেন দোষের হবে?
শিক্ষক-সাংবাদিক সাইদুর রহমান বলেন, যোগ্য শিক্ষকরা যখন সত্য সংবাদ, ফিচার বা বিশ্লেষণ লেখেন– তা সমাজের জন্য ভালো। বরং অযোগ্য ব্যক্তিরা তৃণমূলে সাংবাদিকতার নামে যা করছে, সেটাই নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।
এ বিষয়ে গত দুদিনে কয়েক দফা যোগাযোগ করেও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
নীতিমালা জারির পর কিছু জেলায় শিক্ষা কর্মকর্তারা শিক্ষকদের দ্বিতীয় পেশায় সম্পৃক্ততা যাচাই শুরু করেছেন। গাইবান্ধা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমানের সই করা আদেশে সাত উপজেলার সব মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের আওতাধীন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে সাংবাদিকতা বা আইন পেশায় যারা জড়িত, তাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য ১৪ ডিসেম্বর বিকেল ২টার মধ্যে পাঠাতে হবে।
এ বিষয়ে মো. আতাউর রহমান সমকালকে বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী সাংবাদিকতা, আইনচর্চা বা অন্য কোনো লাভজনক পেশায় নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। তথ্য যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানা গেছে, বর্তমানে সারাদেশে ছয় লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্ত। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে আছেন তিন লাখ ৯৮ হাজার, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় পৌনে দুই লাখ এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে আছেন ২৩ হাজারের বেশি শিক্ষক ও কর্মচারী।
কেন এই সিদ্ধান্ত
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অন্য পেশায় যুক্ত থাকার সুযোগ বন্ধ করা ও নির্বাচনী প্রচারে যুক্ত হওয়ার সুযোগ বন্ধের প্রস্তাব করা হয়েছিল সরকারের কাছে। এরই অংশ হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্ত এসেছে।
গত ১৭ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ৬৪ জেলার ডিসি ও আট বিভাগীয় কমিশনারের মতবিনিময় সভায়ও ফের এ দাবি জানানো হয়। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় রাজশাহী বিভাগের এক ডিসি জানান, এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা এখন মূল বেতনের পুরোটা সরকার থেকে পান। এর সঙ্গে সামান্য কিছু ভাতা দেওয়া হয় তাদের। জাতীয় নির্বাচনে তারা প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং এবং পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসব কর্মকর্তা কেন্দ্র ও কক্ষের পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। তাই তারা সাংবাদিকতায় থাকলে বা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান থাকলে সুষ্ঠু ভোট গ্রহণে প্রতিবন্ধকতার শঙ্কা রয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে ডিসিরা প্রস্তাব দিয়েছিলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা বেসরকারি হওয়ায় তারা সরাসরি রাজনীতি করার সুযোগ পান। এই সুযোগ বন্ধ হওয়া উচিত। তাই সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার মতো এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর জন্যও সুনির্দিষ্ট বিধিমালা করার প্রস্তাব এসেছিল। তবে সরকারের তরফে এ বিষয়ে তখন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য সরকারি কর্মচারীর মতো একটি বিধিমালা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ঝিনাইদহের তৎকালীন ডিসি মনিরা বেগম। প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলা হয়েছিল, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সরাসরি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এতে পাঠদান কার্যক্রমে দায়সারা আচরণ দেখা যায়। বিধিমালা হলে শিক্ষকতার পাশাপাশি ঠিকাদারি, সাংবাদিকতাসহ একাধিক পেশায় যুক্ত থাকার প্রবণতা ঠেকিয়ে শিক্ষকদের পাঠদানে আন্তরিক করা যাবে।
শিক্ষক সংগঠনগুলোর মিশ্র প্রতিক্রিয়া
শিক্ষক সংগঠনের একাংশ নীতিমালা বাস্তবায়নকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে অন্য অংশের আশঙ্কা– অতিরিক্ত আয়ের প্রয়োজন, সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়তা এবং পেশাগত চাপের কারণে অনেক শিক্ষক নানা কাজে যুক্ত থাকেন। তাদের ওপর কঠোর ব্যবস্থা নিলে শিক্ষা ক্ষেত্রে সংকট ও অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
কেউ কেউ বলছেন, যোগ্য শিক্ষকদের সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করা হলে স্থানীয় গণমাধ্যম আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব দেলাওয়ার হোসেন আজিজী সমকালকে বলেন, নীতিমালায় ইতিবাচক দিক আছে। তবে কিছু বিষয় বৈষম্য ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। সাংবাদিকতা ও আইন পেশাকে একই সঙ্গে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

